মাতৃত্ব/ মাতৃত্বে নারীবাদ/ নারীবাদী মাতৃত্ব- লেখাটি পড়ুন

0
2

নারীবাদ যেমন মাতৃত্ব নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তেমনি মাতৃত্ব নারীবাদের প্রয়োজনটাকে আরও সামনে নিয়ে আসে। নারীবাদ বলে একটা মেয়ে কখন মা হবে, আদৌ হবে কিনা সেটা কেবলমাত্র একটা মেয়ের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত, সমাজের চাপিয়ে দেয়া দায় না। আবার একটা মেয়ে মা হওয়ার মাত্রই তার যাবতীয় সকল বৈশিষ্ট্য ভুলে তাকে একমাত্র মা হিসেবেই বিচার করাটাও নারীর তথা সমাজের উন্নয়নের পথে অনেক বড় একটা অন্তরায়।

একটা মানুষ ঠিকঠাক-মত বড় করে তুলতে পারাটা খুব সরল দায়িত্ব কিন্তু না। ধৈর্য, অধ্যবসায়, সাহস, সৃজনশীলতা, নিত্যনতুন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এই সবই একজন মায়ের মধ্যে থাকতে হয়। পৃথিবীর আর কোন কাজ, পড়াশুনাতে একই সাথে এতগুলো ব্যাপারে পারদর্শী হতে হয় বলে আমার জানা নেই। তাই মা হওয়াটাকে খুব হালকা-ভাবে নেয়াটা যেমন মূর্খতা তেমনি আবার এত কঠিন একটা বোঝা একজন মানুষের কাঁধে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত সমাজের কাঠগড়ায় দাড় করানোটাও মূর্খতা।

মাতৃত্ব অবশ্যই সবচেয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোর একটা। আমি সবসময় খুব চমৎকার একজন মা হতে চেয়েছি। আমার মাতৃত্ব পরিচয় নিয়ে আমি যথেষ্ট উচ্ছ্বসিত কিন্তু ঝামেলা লাগে তখন যখন আমাকে কেউ শুধুই মা বলে পরিচিত হতে বলে। আমি একটা চমৎকার বাচ্চাকে পৃথিবীর জন্য বড় করে দিয়ে যেতে চাই তার মানে এই না যে এইটাই আমি একমাত্র চাই। আমি আরও অনেক অনেক কিছু করতে চাই, এবং এই চাওয়ার সাথে আমার মাতৃত্বের কোন বিরোধ আমি দেখি না। বিরোধ সেই বাধা প্রতিবন্ধকতার সাথে যেটা মা হওয়ার কারণে/ উপলক্ষে সমাজ প্রতিনিয়ত আমার পথে বিছিয়ে রাখছে।

সমাজের চাপিয়ে দেয়া এই একমাত্র ভূমিকাটা নিয়েই আমার সকল আপত্তি। কেন সমাজ ভাবছে যে মা হওয়া মানেই মেয়েরা পরিপূর্ণ, তার অন্য কোথাও আর কিছু দেবার নেই, বাচ্চা বড় করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর কোন কারণে যদি বাচ্চাটা সঠিক মানুষ না হয়, যেটা না হওয়ার জন্য হাজারটা কারণ থাকতে পারে, তার মধ্যে খুব অল্প কয়েকটাই হয়ত মায়ের সাথে সম্পর্কিত, তবুও সমাজ একটা মাকেই সন্তান মানুষ না করার জন্য ব্যর্থতার গ্লানিতে ভোগাবে। সন্তান ধর্ষিত হলে মায়ের চাকরির দোষ, সন্তান ড্রাগ নিলে মায়ের উচ্চশিক্ষার দোষ। একজন মা হয়ত তার নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে দেশের জন্য মানুষের জন্য হাজার উপকার করেছে অথচ তার সব পরিশ্রম বিফল যদি কোন কারণে তার সন্তান জীবনে সাফল্য না পায়।

আমরা মেয়েদের সামনে দুইটা বিকল্প দিচ্ছি, তোমরা হয় মা হবে অথবা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রতিষ্ঠিত মা হওয়ার কোন সুযোগ সমাজ দিচ্ছে না। এই প্রাগৈতিহাসিক মানসিকতার কারণে ইদানীং অনেক মেয়ে যারা ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও মা হওয়ার কথা চিন্তা করতেও ভয় পায়। মা হওয়ার প্রক্রিয়াটার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় একটা মেয়ের শরীরে যে অদ্ভুত সব পরিবর্তন হয় তা থেকে পরবর্তীতে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার জন্য একজন মানুষের সময় দরকার। সেই সময়টা কি আমাদের কেউ দেয়? অন্য সব প্রাণীর চেয়ে মানুষেরা স্বাবলম্বী হতে অনেক বেশি সময় নেয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটা সচল রাখতে একজন মা তার জীবন থেকে যে পরিমাণ সময় আর সম্ভাবনা খরচ করে সেটাকে পুষিয়ে নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সহায়তা কি সমাজ তাকে দেয়?

মাতৃত্ব-কালীন ছুটিটাকে এখনও এদেশের বেশিরভাগ মানুষ অপ্রয়োজনীয় চোখে দেখে। মাতৃত্ব-কালীন ছুটি কাটিয়ে এসে সহকর্মীদের ভ্রূকুটি আর বাঁকা কথা সহ্য করেনি এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া বিরল হবে এদেশে। আমার চেয়ে অর্ধেক মেধা আর শ্রম খরচ করা ছেলেটাও ভাবছে আমার আর চাকরি করার কি দরকার? মা হওয়ার পর আমার মেধা বা শ্রম দেয়ার ক্ষমতা তো জাদুবলে কমে যাচ্ছে না তবুও মা হলেই এমন ভাবার কারণ হল সফল মা হওয়াই একটা মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য এই চিন্তার যায়গাটা থেকে বের হতে না পারা।

বাচ্চা সামলে পড়াশুনা, চাকরি করার জন্য একজন মেয়ের যে সহায়ক ব্যবস্থা দরকার সেরকম কিছু আমাদের দেশে এখনও নেই। যদি কারো বর বা শাশুড়ি দয়া করে সাহায্য করে সে আগাবে নতুবা ঘরে বসে থাকতে হবে। চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও মারাত্মক। প্রেগ্ন্যান্সির কারণে চাকরি হারিয়েছে, মা হওয়ার পর ছুটি পায়নি তাই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে অথবা মা হওয়ার কারণে চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এরকম ঘটনা এদেশে ভুঁড়ি ভুঁড়ি। যাদের এইসব পলিসি নিয়ে কাজ করার কথা তারা নিজেরাও ধরে বসে আছে যে মা হওয়ার পর আবার এত বাইরে দৌড়াদৌড়ি করার দরকার কি, বাচ্চা বড় করলেই তো মেয়েমানুষের জীবন সার্থক। এই অবস্থার থেকে বের হয়ে আসতে হলে, মায়েদের জন্য সহনশীল, সহায়ক কাজের পরিবেশ তৈরি করতে হলে সবার আগে এই “একমাত্র সাফল্য” জাতীয় মানসিকতা থেকে মানুষকে বের হয়ে আসতে হবে।

আমাদের দেশের মাতৃত্ব নিয়ে আরেক ক্ষতিকর অভ্যস্ততা হল মাকে অতিমানব জাতীয় কিছু ভাবার রীতি। তাই মা হওয়ার পর একজন নারীর যে সাধারণ আর দশটা মানুষের মত দুঃখ, কষ্ট, হতাশার বোধ থাকতে পারে মাকে মহামানব বানাতে গিয়ে সেটাকে আমরা প্রতিনিয়ত অস্বীকার করি, পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন বা বেবি ব্লুকে সামাজিক ভাবে মানা তো অনেক দূরের ব্যাপার। আমরা ভেবে নিচ্ছি মা হওয়ার পর সে এতই খুশি আর সুখে পরিপূর্ণ থাকবে যে তার আর কোন ইচ্ছে অনিচ্ছা ভালো লাগা মন্দ লাগার অনুভূতি হওয়ারই কথা না। এর চেয়ে অসার যুক্তিহীন চিন্তা হতে পারে বলে আমার ধারনা নেই।

কিন্তু তার বিপরীতে বাবা হওয়ার ব্যাপারটাকে আমরা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি কি? বাবা হওয়ার পর ছেলেদেরকে আমরা অসাধারণ ভাবছি না, তার সকল অনুভূতি ঠিকঠাক আগের মতই থাকছে ধরে নিচ্ছি। বাবা হওয়াটা সবচেয়ে সম্মানের না? তাই বাবা হওয়ার পরও ছেলেদের অনেক কিছু হতে হয়, হতে চাইতে হয় মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য?
একটা ব্যাখ্যা অনেকে দেয় যে মা হলে মেয়েদের হরমোনের পরিবর্তনের কারণে বাচ্চার প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়। কিন্তু এখনকার রিসার্চ বলছে সেটা ছেলেদের ক্ষেত্রেও হয়। মায়েদের যেমন সন্তানের ব্যাপারে মমতা বাড়ানোর জন্য হরমোনের উঠানামা আছে তেমনি বাবাদেরও আছে। তাই সন্তান জন্মের পর শুধু মা না বাবারাও বদলায়, বদলানোর কথা, বদলানো দরকারও।

আমরা সন্তান লালনের পুরো প্রক্রিয়াটাতে মায়েদের একছত্র আধিপত্য দিয়ে রেখেছি। যে বাবা বাইরে হাজারও কঠিন সমস্যার সমাধান করছে, বাচ্চাকে দুধ বানিয়ে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ান বা ডায়াপার বদলের মত ছোট সহজ কাজগুলিও তারা করতে পারবে না ভাবা হয়। ব্যক্তিগতভাবে সমাজের ছেলেদেরকে এই অথর্ব ভাবার রীতিটাকে আমি খুব অপছন্দ করি। বাচ্চা পালার দক্ষতা নিয়ে কিন্তু মেয়েরাও জন্মায় না। প্রথমবার মা হলে একজন নারী যেমন সব আস্তে আস্তে শিখে নিতে পারে একজন স্বাভাবিক বুদ্ধির পুরুষও সেটা পারে। এবং নিজের বাচ্চার দেখভাল করার জন্য মহাপুরুষ হওয়ার দরকার নেই, একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হওয়াই যথেষ্ট।

ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য একটা মানুষকে রেখে যাওয়া খুব বিশাল একটা দায়িত্ব। একটা ভাল মা হতে চাওয়ার স্বপ্ন দেখাটার মধ্যেও কোন সমস্যা নেই। সমস্যা হল যখন ছেলেদের ইচ্ছের মধ্যে ভালো বাবা হওয়ার আকাঙ্ক্ষাটা সেভাবে উঠে আসে না। অথচ আমরা যে সাম্যের পৃথিবী দেখতে চাই, সন্তান লালন পালনের মত এত মূল্যবান একটা কাজকে একমাত্র নারীর উপর চাপিয়ে দিয়ে সেই পৃথিবী আমরা কখনই পাব না। আবার এখন অনেক গবেষণা বলছে সন্তানের মানসিক বিকাশের জন্য মা বাবা দুজনের সান্নিধ্যই প্রয়োজন। মা সবকিছু ছেড়ে বাসায় বসে আছে আর বাবা সংসারের অর্থের জোগান দিতে গিয়ে বাচ্চাকে সময় দিতে পারছে না এটা কখনই একটা আদর্শ সংসারের চিত্র হতে পারে না। ভালো মা এবং ভালো বাবা দুটোই সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে জরুরী সূচক।

মাকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে তার মানুষ রূপটাকে অবজ্ঞা/ অবহেলা করা বন্ধ করুণ। সন্তান বড় করার জন্য মা বাবা দুজনেরই ভূমিকা এবং দায় আছে। কাউকে তার লৈঙ্গিক পরিচয় দিয়ে বিচার করে তার ভূমিকাকে গন্ডিবদ্ধ করে না দিয়ে পৃথিবীর জন্য পুরুষ নারী উভয়েরই দায়কে স্বীকার করতে শিখুন। মেরী কুরি যদি সব ছেড়ে শুধু বাচ্চা পালায় মন দিতেন তাহলে আমরা রেডিয়াম পোলনিয়াম পেতাম না, আবার উনি মা না হলে আমরা উনার নোবেল পাওয়া কন্যাটাকেও পেতাম না। কেউ মা হোক অথবা না হোক তার যোগ্যতা আর সাফল্যকে মেধা, শ্রম, ইচ্ছে, আন্তরিকতার সূচক দিয়ে বিচার করতে না শিখলে সমাজ শুধু পিছন দিকেই হাঁটতে থাকবে। আবার একজন নারী তার নিজের শরীর, সুস্থতা, সম্ভাবনা, সময়কে বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। এটা তার জন্য প্রকৃতির বেধে দেয়া একটা বিশেষায়িত কাজ, কিন্তু এটা তার একমাত্র কাজ না। এই সহজ সত্যটা মেনে তাকে তার এই কাজে সকল ক্ষেত্রে সাহায্য করা, তাকে মাতৃত্ব-কালীন আর পরবর্তীতে বিশেষ সুবিধা দেয়াটা যে রাষ্ট্র সমাজ তথা আমাদের সকলের দায়িত্ব, এই বোধটুকু হওয়াটাও সভ্য সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অনস্বীকার্য।

লেখক ঃ মিলন চৌধুরী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here