মোঘলদের রক্তে রঞ্জিত ব্রিটিশ জাদুঘরের চুরি করা মহামূল্যবান ৫ বস্তু

0
48

ইতিহাসের বই পড়তে পড়তে বড় হওয়া যেকোনো প্রজন্মের কাছে লন্ডন একটু স্বপ্নের শহর। ব্রিটিশদের ইতিহাস যদি আপনাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে, তবে নিঃসন্দেহে লন্ডন আপনাকে মুগ্ধ করে দেবে। বিগ বেন, বাকিংহাম প্যালেসসহ লন্ডনের দর্শনীয় স্থানগুলোর তালিকায় বেশ উপরের দিকে থাকবে ব্রিটিশ জাদুঘরের নাম। সুসজ্জিত এই জাদুঘরটি তার অভিজাত সংগ্রহশালার জন্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, আপাতদৃষ্টিতে দেখে চমকে ওঠার মতো এই সংগ্রহশালার মহামূল্যবান অনেক বস্তুর সাথেই মিশে আছে কলঙ্কজনক অধ্যায়, তাদের গায়ে এখনো লেগে আছে রক্তের প্রলেপ। খালি চোখে দেখে বোঝার জো নেই যে এই অসাধারণ জিনিসগুলো ভারতবর্ষ, আফগানিস্তান, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা পাড়ি দিয়ে এই পর্যন্ত আসতে কত নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছে, কত কাঠখড় পুড়িয়েছে। ৯৪টি গ্যালারি সমৃদ্ধ অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত ব্রিটিশ জাদুঘরের খুব পরিচিত কিছু বস্তু চুরি বা লুট করা হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে। এবার তাহলে তেমনি ৫টি বস্তুর সাথে পরিচিত হওয়ার পালা।

১. কোহিনূর

কোহিনূর (আদিঃ কোহ-ই-নূর) সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি। ১০৫.৬০ ক্যারেটের জগদ্বিখ্যাত এই হীরেটি যে ভারতবর্ষেরই সম্পদ, এটাও আমাদের অবিদিত নেই। কোহিনূরের আসল নাম সামন্তিক মণি এবং প্রথমে এটি ছিল ৭৯৩ ক্যারেটের। গোলকুণ্ডার কল্লুর খনির রায়ালসীমা হীরকখনি থেকে এটিকে পাওয়া যায় কাকাতিয়া বংশের আমলে।

মালওয়ার রাজপরিবারে কয়েক প্রজন্ম ধরে থাকার পর এটিকে ১৩০৬ (মতান্তরে ১৩১০ কিংবা অন্যান্য মতবাদও বিদ্যমান) সালে কেড়ে নেন আলাউদ্দিন খিলজি। নানা পরিক্রমায় সেটি ইব্রাহিম লোদীর হাতে এসে পৌঁছায়। পরবর্তীতে বাবর পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে হারিয়ে দিলে লোদীর মা তাদের পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি বাবরপুত্র হুমায়ুনকে দেন। আবার অনেকের মতে গোয়ালিয়রের রাজঘরানা থেকে হুমায়ুনকে হীরেটি উপহার হিসেবে দেয়া হয়। কোহিনূরকে তাই বাবরের হীরেও বলা হয়। ১৭৩৯ সালের আগ অব্দি এটিকে সেই নামেই ডাকা হত।

পরবর্তীতে হুমায়ুন ভারতবর্ষে তার শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পারস্যের শাহ তামাস্পের সাহায্য প্রত্যাশা করেন এবং তাকে হীরেটি উপহারস্বরূপ দেন। শাহ তামাস্প সেটিকে উপহার হিসেবে ডেকান রাজ্যে পাঠিয়ে দেন। ঐতিহাসিক এই হীরেটি নানা হাত ঘুরে আবারো মুঘল শাহী বংশে ফেরত আসে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে। মীর জুমলা নামক পারসি হীরে ব্যবসায়ীর মাধ্যমে হীরেটি আবারো মুঘলদের কাছে আসে এবং ১৭৩৯ সালের আগ পর্যন্ত সেটি মুঘলদের কাছেই ছিল। এরপর নাদির শাহ ভারবর্ষ আক্রমণ করে কোহিনূর সাথে করে পারস্যে নিয়ে যান।

কথিত আছে যে, পারস্য সম্রাট নাদির শাহ কোনোভাবে জেনে যান মুঘল বাদশাহ মোহাম্মদ শাহ তার পাগড়ির ভেতর হীরেটি লুকিয়ে রাখেন। তাই তিনি দুই সাম্রাজ্যের লোক দেখানো সহযোগিতাপূর্ণ বন্ধনের সম্মানে একটি গতানুগতিক পাগড়ি বিনিময়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এরপর মুহম্মদ শাহ এর পাগড়িটি হস্তগত হলে তিনি তার ভেতরে হীরেটি পেয়ে যান এবং এর জ্যোতি দেখে তার মুখ দিয়ে বেড়িয়ে যায়- ‘কোহ-ই-নূর’ শব্দটি, যার অর্থ আলোর পাহাড়। সেই থেকে এটি কোহ-ই-নূর নামেই পরিচিত যাকে কালের পরিক্রমায় বর্তমানে কোহিনূর বলা হয়।

১৭৪৭ সালে নাদির শাহ এর মৃত্যুর পর হীরেটি আহমাদ শাহ আবদালীর হস্তগত হয়, তার প্রয়াণের পর আফগানরা এটি শিখ ও পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিং এর নিকট সমর্পণ করে। আবদালীর বংশধর শাহ সুজা উল মালিক দুররানি হীরেটিকে পাঞ্জাবের মহারাজার কাছে দেন, বিনিময়ে মহারাজা রঞ্জিত সিং তাকে আফগানিস্তানের সিংহাসন ফিরে পেতে সাহায্য করেন।

১৮৩৯ সালে মহারাজা রঞ্জিত সিং তার মৃত্যুশয্যায় কোহিনূরের মালিকানা পুরির জগন্নাথ মন্দিরকে দিলেন বলে অসিয়ত করে যান। কিন্তু তার পুত্র দুলীপ সিং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে এঁটে উঠতে পারেননি। অতঃপর ১৮৪৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দুলীপ সিং এর কাছ থেকে হীরেটি হস্তগত করে। মূলত ব্রিটিশরা সে সময় পাঞ্জাব বিজয় করে এবং লাহোর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুসারে শাহ সুজা উল মালিকের থেকে পাঞ্জাবের মহারাজার পাওয়া কোহিনূর হীরাটিকে লাহোরের বর্তমান মহারাজা বৃটেনের রাণী ভিক্টোরিয়ার নিকট সোপর্দ করবেন। বলা হয় এরপর হীরেটি জন লরেন্সের কাছে রাখা ছিল। পরবর্তীতে লর্ড ডালহৌসি লরেন্সকে হীরেটি লাহোর থেকে মুম্বাই পাঠাতে বলেন। এরপর ১৮৫০ সালের ৬ই এপ্রিল এইচ.এম.এস ম্যাডিয়া জাহাজে করে লর্ড ডালহৌসি ব্যক্তিগতভাবে কোহিনূর বহন করে ইংল্যান্ড নিয়ে যান। ১৮৫১ সালে দুলীপ সিং কর্তৃক রাণীকে হীরেটি দেবার জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

মূল হীরেটিকে কাটা হয় এবং রাজমুকুটে বসানো হয়। এই কাজটি করে গ্যারার্ড এন্ড কোং নামক কোম্পানি। ১৯১১ সালে রাণী মেরি দিল্লী রাজ্যাভিষেক দরবারে মুকুটটি পড়েন। ১৯৩৭ সালে সেটিকে স্থানান্তরিত করা হয়  বর্তমান রাণী এলিজাবেথের এখতিয়ারাধীন রাজমুকুটটিতে। ভারত থেকে অসংখ্যবার কোহিনূর ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে, তবে ফিরিয়ে দেবার কোনো ইচ্ছা বা পদক্ষেপের লেশমাত্র নেয়নি বৃটেন। ২০১৩ সালে ভারত সফরকালে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জানান দেন তারা ফেরততত্ত্বে বিশ্বাসী নন।

অতঃপর ভারত সরকার থেকে বলা হয় কোহিনূরের মালিকানা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না, কারণ এটি বলপূর্বক কেড়ে আনা হয়নি, বরং ভারত থেকে ব্রিটিশদের উপহারস্বরূপ দেয়া হয়েছিল। যদিও অনেকেই এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক এ হীরেটির গায়ে লেগে আছে অভিশাপও। জনশ্রুতি আছে কোহিনূর শুধুমাত্র মেয়েরাই পরিধান করতে পারে, ছেলেরা পরলে হীরেটির সাথে যুক্ত অভিশাপ তার দুর্ভাগ্য ডেকে আনে।

২. সম্রাট শাহজাহানের রাজকীয় সুরাপাত্র

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শিল্পকলা ও কারুকার্যের প্রতি যে প্রচুর আগ্রহ ছিল এর নানা নিদর্শন বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তেমনি একটি হলো সাদা রঙের নেফ্রাইট জেড দিয়ে তৈরি এই রাজকীয় সুরাপাত্র। এটির মূল উপকরণ জেড পাথরগুলি মধ্য এশিয়া নতুবা চীন থেকে আমদানিকৃত। শাহজাহানের জন্য বিশেষভাবে নকশাকৃত এই সুরাপাত্রটির অস্তিত্ব ছিল ১৬৫৭ সালে। সুরাপাত্রটির দৈর্ঘ্য ১৮.৭ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ১৪ সেন্টিমিটার। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর এটি কর্নেল চার্লস সেটন গুথরির হাতে আসে এবং নানা হাত ঘুরে একসময় এটির মালিকানা লাভ করেন যুগোস্লাভিয়ার রাণী মারিয়া। অবশেষে ১৯৬২ সালে ভিক্টোরিয়া এন্ড আলবার্টস মিউজিয়ামে জায়গা হয় জেড পাথরে তৈরি এই সুরাপাত্রের।

৩. নাসাক ডায়মন্ড

ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের মাহবুবনগরের অমরগিরি খনিতে এটি পাওয়া যায়। বর্তমানে ৪৩.৩৮ ক্যারেটের নীলচে-সাদা এই হীরেটিকে প্রথমবার ভারতেই কাটা হয়। ১৫০০-১৮১৭ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের নাসিকের নিকটবর্তী ত্রিম্বাকেশ্বর শিব মন্দিরে শিবের চোখ হিসেবে এটি বসানো ছিল। অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এটি হস্তগত করে এবং ১৮১৮ সালে তারা সেটি ব্রিটিশ জহুরী রুনডেল এবং ব্রিজের কাছে বিক্রি করে দেয়। ঐ বছরেই রুনডেল এবং ব্রিজ সেটিকে পুনরায় কেটে প্রথম মারকুইস অফ ওয়েস্টমিনস্টারের তরবারির হাতলে বসান।

১৯২৭ সালে নানা হাত ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে আসে এই মোটামুটিভাবে পিরামিডাকৃতির এই হীরেটি। পরে আমেরিকান জহুরী হ্যারি উইনস্টন ১৯৪০ সালে প্যারিসে হীরেটি পান এবং সেটিকে কেটে বর্তমান নিখুঁত ৪৩.৩৮ ক্যারেটে আনেন। ১৯৪২ সালে তিনি এটিকে নিউ ইয়র্কের একটি জুয়েলারি ফার্মে বেচে দেন। ১৯৪৪ সালে মিসেস উইলিয়াম বি. লিডস এটিকে ষষ্ঠ বিবাহবার্ষিকীর উপহার হিসেবে পান ও আংটিতে পড়েন। নাসাক ডায়মন্ডটি সর্বশেষ ১৯৭০ সালে নিউইয়র্কে পাঁচ লাখ ইউএস ডলারে নিলামে বিক্রি করা হয় এডওয়ার্ড জে. হ্যান্ডের কাছে। হীরেটির বর্তমান বাজারমূল্য ৩.০৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

৪. সুলতানগঞ্জের বুদ্ধমূর্তি

১৮৬১ সালে রেলওয়ে নির্মানের কাজ করার সময় বিহারের ভাগলপুর জেলার সুলতানগঞ্জ শহরে সম্পূর্ণ ধাতব এই মূর্তিটি পাওয়া যায়। মূর্তিটির ওজন প্রায় ৫০০ কেজি। রেইলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার ই.বি. হ্যারিস তৎক্ষণাৎ এটিকে বার্মিংহামে পাঠিয়ে দেন।  প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে মূর্তিটি ৫০০-৭০০ খ্রিষ্টাব্দের। বর্তমানে এটি ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের বার্মিংহাম মিউজিয়াম এন্ড আর্ট গ্যালারীর শোভাবর্ধন করছে।

৫. টিপু সুলতানের তরবারি ও আংটি

মহীশুরের বাঘ টিপু সুলতানের বীরোচিত মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সৈন্যদল তার সম্পদ লুঠ করে এবং তার তরবারি ও আংটিটি সাথে করে নিয়ে যায়। ২০০৪ সাল পর্যন্ত এগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়ামেই প্রদর্শিত হচ্ছিল। বিজয় মাল্য নামক ভারতীয় ব্যক্তি ১১ লাখ ৭৫ হাজার ইউরো দিয়ে নিলামে টিপু সুলতানের তরবারিটি কিনে এটিকে পুনরায় ভারতবর্ষে ফিরিয়ে আনেন। এছাড়াও আরো অর্থ খরচ করে তিনি সুলতানের ৩০টি যুদ্ধ সামগ্রী ফিরিয়ে আনেন যার মধ্যে বাঁকানো তূণ, ফ্লিন্টক পিস্তল, কামান এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস বিদ্যমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here