প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যবসায় নারীর আগ্রহ বাড়ছে

0
30

বান্দরবানের মেয়ে ড চিং চিং। ছোটবেলা থেকে আগ্রহ রংতুলিতে। নিজে নিজে শিখেছেন আঁকাআঁকি। রিকশাচিত্রের ঢঙে ছবি আঁকেন। তাঁর ক্যানভাস কখনো কাচের বোতল, কখনো কেটলি, টি-পট, কখনোবা পানদানি। ২০১৫ সালে ফিনেরি নামে নিজের ব্যবসায় উদ্যোগ শুরু করেন ড চিং চিং। আঁকা পণ্য ফেসবুক পেজ এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিক্রি করেন।

ড চিং চিং এখন থাকেন ঢাকায়। নিজের বাসাতেই ফিনেরির পণ্য তৈরি করেন। প্রথম আলোকে তিনি বললেন, ‘অনলাইনে ফরমাশ নিয়ে পণ্য সরবরাহ করতাম। গুলশান-বনানীতে আমাদের পণ্যের চাহিদা আছে, তাই সেখানকার দুটি দোকানে এখন পণ্য পাওয়া যায়। আগে নিজেই ছবি এঁকে পণ্য তৈরি করতাম, এখন আরও দুজন কর্মী ছবি আঁকেন।’

প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এ রকম ব্যবসায় উদ্যোগকে বলা হচ্ছে স্টার্টআপ। বৈশ্বিকভাবে স্টার্টআপ হলো সেই উদ্যোগ, যেগুলো প্রচলিত ব্যবসার চেয়ে কিছুটা আলাদা। সাধারণত তরুণ উদ্যোক্তারা কিছুটা উদ্ভাবনী চিন্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে ব্যবসায় উদ্যোগ শুরু করেন। পণ্য উৎপাদন, বিপণন, বিক্রয়, বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হয় স্টার্টআপে। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার থাকে, আবার প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপের সংখ্যাও কম নয়।

২০১৪ সাল থেকে দেশে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করায় বাংলাদেশেও তরুণদের মধ্যে স্টার্টআপের একটা ধারা বেগ পেতে শুরু করেছে। আর তাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। স্টার্টআপগুলোর মধ্যে ই-কমার্স অর্থাৎ ওয়েবসাইট, বিশেষ করে ফেসবুকভিত্তিক পণ্য বিপণন (এফ-কমার্স) উদ্যোগগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো।

ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সভাপতি এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) পরিচালক শমী কায়সার প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৭ সালে তাঁদের করা প্রাথমিক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে ই-কমার্স উদ্যোগগুলোর ৪০ থেকে ৪২ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা।

হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে মরগ্যান স্ট্যানলি, নকিয়া ও ভিস্টাপ্রিন্টে চাকরি করে দেশে ফিরে নিজের উদ্যোগ শুরু করেন মালিহা কাদির। বাস ও লঞ্চের টিকিট বিক্রি করতে চাইলেন ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সহজ ডটকম’। ওয়েবসাইট ও স্মার্টফোনের অ্যাপভিত্তিক সহজ ডটকম থেকে বাস, লঞ্চের টিকিটের পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা ও বিভিন্ন আয়োজনের টিকিট বিক্রি করা হয়।

কয়েক মাস আগে ঢাকা শহরে ‘সহজ রাইড’ নামে অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেলে পরিবহন সেবার একটি স্টার্টআপও চালু করেছেন মালিহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্টার্টআপে নারী উদ্যোক্তাদের সুবিধা-অসুবিধা পৃথিবীর সব দেশেই মোটামুটি এক রকম। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যোগাযোগ, আর্থিক সহায়তা ইত্যাদি বেশি, আমাদের এখানে যা এখনো কম।’

দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সহসভাপতি ফারহানা এ রহমান জানান, তিনি যখন প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় শুরু করেন, তখন নারীর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এখন অনেকেই আসছেন। সরকারি প্রণোদনা আছে। স্টার্টআপের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বন্ধকবিহীন ব্যাংকঋণের সুবিধাও আছে। কিন্তু ঋণসুবিধা পেতে যেসব শর্ত চাওয়া হয়, সেগুলো পূরণ করা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

শমী কায়সার বলেন, ‘ব্যাংকগুলো এখনো ই-কমার্সকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) হিসেবে দেখে। ই-কমার্স ও এসএমই আলাদা। এ জায়গায় নীতিমালা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।’

স্টার্টআপে উদ্যোক্তারা আসছেন নানা রকম সৃজনশীল ধারণা নিয়ে। গত বছর ‘কুক আপস’ নামে চালু হয়েছে একটি স্টার্টআপ। অ্যাপ ও ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে ঘরে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয় এটি থেকে। কুক আপসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নামিরা হোসেন বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ৬০০ রান্নাবিদ রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই নারী।’

সৌন্দর্যচর্চা কেন্দ্র ঘরেই চলে যাবে এমন সেবা দিচ্ছে নাজিফা চৌধুরীর ‘বিডি পারলার’। নারী উদ্যোক্তা পরিচালিত পুনহ ডটকম পোশাক থেকে উপহারসামগ্রী বিক্রি করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। তাসলিমা মিজির ‘গুটি পা’ চামড়ার ব্যাগ, স্যান্ডেল ইত্যাদি তৈরি করিয়ে বিক্রি করে অনলাইনের মাধ্যমে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার প্রথম আলোকে জানান, ‘শি পাওয়ার’ নামে তাঁরা একটি প্রকল্প শুরু করছেন, যেটার লক্ষ্য শুধু নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা। প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নারীদের প্রস্তুত করে দেওয়াই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘আইসিটি বিভাগ বা বেসিসের যত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কোথাও নারীর অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশের বেশি দেখিনি। তাই শি পাওয়ার শুধু মেয়েদের জন্যই। শুরুতেই ১০ হাজার নারী এতে অংশ নেবেন।’

সম্প্রতি ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হলো উইমেন টেক এক্সপো। এতে ৩৫ জন নারী উদ্যোক্তা তাঁদের স্টার্টআপ নিয়ে অংশ নেন। এ মেলা আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নারী পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ উইমেন ইন ইনফরমেশন টেকনোলজির পরিচালক লাফিফা জামাল। তিনি বলেন, আগেরবারের চেয়ে এবার নারী উদ্যোক্তার স্টার্টআপের সংখ্যা বেশি। তাঁদের উদ্যোগগুলোও বেশ অভিনব। ফলে এ কথা বলাই যায়, সৃজনশীলতার সঙ্গেই নারীরা প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় উদ্যোগে এগিয়ে আসছেন এবং সাফল্যও পাচ্ছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here